বিনিয়োগকারীরা ধরেই নিয়েছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিজনিত অনিশ্চয়তা কেটে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছিল। তবে সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপক রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণা সেই পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টে দিয়েছে। এদিন জাপান, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের বার্তা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায় মার্কিন পুঁজিবাজারে, যার বিপরীতে গতকাল অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল এশিয়ার বাজার। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে আলোচনার কৌশল হিসেবে মনে করছেন এশিয়ার বিনিয়োগকারীরা। আবার নিক্কেই এশিয়ায় কোনো কোনো বিশ্লেষক মত দিয়েছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন এশিয়ার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা। ফলে এশিয়ার পুঁজিবাজারে এর প্রভাব পড়েছে তুলনামূলক কম।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার লেনদেন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ডাও জোন্স সূচক ৪২২ পয়েন্ট বা দশমিক ৯৪ শতাংশ কমে যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ৭৯ শতাংশ ও প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট দশমিক ৯২ শতাংশ হ্রাস পায়। প্রায় তিন সপ্তাহের মধ্যে এটিই ছিল তিনটি সূচকের সবচেয়ে খারাপ দিন।
আগের দিনের তুলনায় তেমন হেরফের ছাড়াই মঙ্গলবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। গতকাল সকালে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ৫ ও দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ে। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক দশমিক ৩ ও অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক দশমিক ১ শতাংশ বাড়ে।
এ বিষয়ে আইজি অস্ট্রেলিয়ার বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, ‘মার্কিন ইকুইটি ও নিক্কেই ফিউচারে তুলনামূলকভাবে মৃদু পতন দেখা যাচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাজার আগে থেকেই এমন কিছু প্রত্যাশা করছিল। তিন মাস আগের লিবারেশন ডে ভূমিকম্পের পর এটি যেন আফটারশক।’
এদিন বাংলাদেশ, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, কাজাখস্তান, লাওস ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশের ওপর ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন মাত্রার শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আলাদা চিঠির মাধ্যমে শুল্ক আরোপের বার্তা দেন তিনি, যা খাতভিত্তিক শুল্ক থেকে আলাদা। ঘোষিত শুল্কহার পরিবর্তনযোগ্য বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সোমবার লেনদেনের শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কহারের বার্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল ওয়াল স্ট্রিটে। কারণ আগের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, সোমবার দুপুরে বিভিন্ন দেশের উদ্দেশে ‘ট্যারিফ লেটার’ পাঠাবেন। এর আগে শুক্রবার তিনি জানিয়েছিলেন, চিঠিতে ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন শুল্কহার উল্লেখ থাকবে। মূলত আলোচনা ও সমঝোতা সুযোগ তৈরিতে শুল্ক আরোপের সময়সীমা ৯ জুলাই থেকে তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত জাপানি বৃহৎ গাড়ি কোম্পানিগুলো বড় ধরনের প্রভাবিত হয়। এদিন টয়োটা, নিশান ও হোন্ডার শেয়ারদর কমেছে যথাক্রমে ৪, ৭ দশমিক ১৬ ও ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি কোম্পানিতে। এলজি ডিসপ্লে ও এসকে টেলিকমের শেয়ারদর কমেছে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩ ও ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
এছাড়া মার্কিন সরকারি বন্ডের দামও পড়ে যায়। ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৯ এবং ৩০ বছরের বন্ডের ইল্ড হয় ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। এছাড়া মার্কিন ডলার সূচক দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে বিনিময় হার বেড়েছে। এর বিপরীতে দুর্বল হয়েছে জাপানি ইয়েন, দক্ষিণ কোরিয়ার ওন ও দক্ষিণ আফ্রিকার র্যান্ড।
বিয়ার্ডের বিনিয়োগ কৌশলবিষয়ক বিশ্লেষক রস মেফিল্ড জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত শুল্কহার মার্কিন বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। এ কারণে এদিন ব্যাপক হারে শেয়ার বিক্রি হয়েছে।
অন্যদিকে মর্নিংস্টারের এশিয়ান ইকুইটি মার্কেট বিভাগের কৌশলবিদ কাই ওয়াংয়ের মতে, বিনিয়োগকারীরা ঘোষিত শুল্ককে আলোচনার কৌশল আকারে দেখছেন। ১ আগস্ট নতুন সময়সীমা ধার্য হওয়ায় তাদের এ ধারণা হয়েছে। তারা ভাবছেন আলোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা হয়তো কেটে গেছে। এমনকি ৯ জুলাইয়ের নির্ধারিত সময়সীমা ঘিরে আশাবাদী ছিল ওয়াল স্ট্রিট। জেফরিসের ইউরোপবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমারের মতে, ৯ জুলাইয়ের মূল সময়সীমা বাজারে স্বল্পমেয়াদি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে এবং বাজার মূল্যায়ন ও অবস্থান বিবেচনায় কিছু মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা যাবে। তবে এ চিঠিগুলো অন্যান্য দেশকে দ্রুত চুক্তি করতে উৎসাহিত করতে দেয়া হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরো বাণিজ্য চুক্তি হবে বলে আমরা আশা করা যাচ্ছে। এখন শেয়ারদরে পতনকে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
তবে অনেকে বলছেন, বাজারে আত্মতুষ্টির প্রবণতা আছে। যেমন ওয়েলস ফার্গো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল মার্কেট কৌশলবিদ স্কট রেনের মতে, ওয়াল স্ট্রিটের শুল্কসংক্রান্ত আশাবাদ অতিরঞ্জিত। শুল্কহার স্থির হওয়ার পর অর্থনীতির গতি কমে যেতে পারে এবং ভোক্তা ব্যয়ও হ্রাস পেতে পারে।
এছাড়া নতুন কোনো শুল্ক প্রস্তাব আসে কিনা তাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ওয়াল স্ট্রিট। এফএক্সটিএমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক লুকমান ওতুনুগা বলেন, ‘শুল্কহার প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হলে ফের মন্দার আশঙ্কা ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এতে শেয়ারবাজার ধসে পড়তে পারে এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সম্পদের মূল্য বেড়ে যেতে পারে।’